অন্য জন্মদিন
কাল বিনুর জন্মদিন। বাড়িতে বসে জন্মদিনের প্ল্যান করার কথা বিনুর। কিন্তু তার সেদিকে মন নেই। বাড়িতে তার মন টেকেনা। সুযোগ পেলেই বাইরে বেড়িয়ে পড়ে আর টো টো করে গোটা গ্রাম ঘুরে বেড়ায় ।এই হল তার কাজ ।কি যে খোঁজে সর্বক্ষণ, সবার এটাই প্রশ্ন ।কিন্তু বিনুর খালি মনে হয় , ভালো করে খুঁজে দেখলেই সে এমন একটা কিছু খুঁজে পাবে যা এতদিন কেও খুঁজে পায়নি। সারাদিন ঘুরে ঘুরে কিছুই পেলনা বিনু । অগত্যা হতাশ মনে বাড়ি ফিরে এল । দুপুরবেলা খেতে বসে মা দেখলেন ছেলের মুখ ভার , বললেন –“আমার বিনু সোনার কি মনখারাপ ? কাল তো জন্মদিন ।আজি আমি তোর জন্য বড় একটা কেক বানাবো, তার ওপরে আবার তোর নাম লেখা থাকবে”। বিনু খুশি হল মায়ের কথায় । কিন্তু নিজের পারফরমেন্সে মোটেও খুশি নয় সে। খাওয়ার পর বিছানায় শুয়ে মনে মনে ভাবতে লাগলো , “আমার এবারের জন্মদিনটাও কি ভালো যাবেনা ! কাল আমার ১২বছর পূর্ণ হবে ।এই ১২টা বছরে কত্তোগুলো দিন। কি করলাম আমি এতগুলো দিনে ?কিছুই তো আবিষ্কার করতে পারিনি”।
(পাঠক বন্ধুরা বিনুর মতো বাচ্চা ছেলের এরকম পাকা পাকা চিন্তা-ভাবনা দেখে হয়তো মনে মনে হাসছ ।কিন্তু বিনুর কাছে এটা খুব কষ্টের ।কারন সে নিজেকে বিজ্ঞানী ভাবতো । মায়ের কাছে সে বিজ্ঞান-বিষয়ক অনেক গল্প পড়েছে ।তাই তার পক্ষে নিজেকে বিজ্ঞানী ভাবাটা খুব স্বাভাবিক বলে সে মনে করে।)
হঠাৎ বাগানের দিকের জানলায় পৎ করে একটা আওয়াজ হল, যেন একটা কাদার তাল এসে পড়লো। বিনু সামান্য জিনিসকেও হেলাফেলা করেনা। বারবার জানলা ও বাগানের দিকে তাকিয়ে খুঁজতে লাগলো। অথচ কিছুই তার চোখে পড়লোনা। কিছুক্ষণের মধ্যে ক্লান্ত বিনু ঘুমিয়ে পড়লো। হঠাৎ ঘুমচোখে দেখতে পেল তার পাশে শুয়ে তার মা নয়, একটা বিশাল ডলফিন । কি ব্যাপার হল ! রোজ তো মা শোয় তার পাশে। ভুল দেখছে ভেবে চোখ রগড়াল । ওমা ওকি ডলফিনটা যে ওর দিকে ঘুরে শুল। ভয় পেয়ে গেল বিনু। চিৎকার করতে চাইছে, কিন্তু তার গলা দিয়ে এক বিন্দুও আওয়াজ বেরচ্ছেনা। খাটের এককোণে জড়সড় হয়ে গেছে সে। চোখ বন্ধ করে ফেলেছে। আবার চোখ খুলে দেখতে যাবে –ওমনি সব উধাও।“ আরে এই তো ছিল এখানেই ।কোথায় গেল? আমি কি তবে এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছি্লাম!” অবিশ্বাসের ভঙ্গীতে বিনু একবার খাটের তলা,একবার জানলা ,সব জায়গা খুঁজতে লাগলো। “যাহ, ভাবলাম সত্যিই বোধহয় নতুন কিছু ঘটলো আমার জীবনে ।কিন্তু কোথায় কি!”,কাচুমাচু মুখ করে বলল সে। কোথা থেকে যেন একটা মিষ্টি সুর ভেসে আসছে, আর সেই সুরটাই যেন তাকে বলছে, “মনখারাপ করোনা। আমি এখানেই আছি। কোথাও যাইনি। তুমি ভয় পেওনা। আমি তোমার বন্ধু ”। বিনু তো খুব অবাক, বলল, “তুমি কোথায়? আমি তো আর দেখতেই পাচ্ছিনা”।“আমি তোমার ঘরের ঠিক মাঝখানে”,মিষ্টি সুর বলে উঠলো ।সেই সুর লক্ষ্য করে বিনু ঘরের মেঝেতে দেখতে পেল একটা এক হাত লম্বা মাছ দাঁড়িয়ে আছে। মাছকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে কোনদিনও দেখেনি সে। তাই খুব মজা পেল। অবাক হয়ে দেখতে লাগলো। মিষ্টি সুর বলে উঠলো, “আমি অনেক দূর থেকে এসেছি একটা বিশেষ দরকারে”। বিনু বুদ্ধিমান ছেলে। চটপট বলে উঠলো, “তুমি ভিনগ্রহের প্রাণী ,তাইতো? তুমি সবকিছু জানো। সবার মনের কথা পড়তে পারো, সব ভাষায় কথা বলতে পারো, তোমরা মানুষের চেয়ে অনেক উন্নত শ্রেণীর প্রাণী। আমি মায়ের কাছে সব শুনেছি তোমাদের গল্প।” মিষ্টি সুর আর একটু এগিয়ে এসে বলল, “এতকিছু জানো তবু ভয় পেলে কেন যখন তোমার পাশে শুয়েছিলাম?” বিনু তো অবাক! “আরে ওটা তো অনেক বড়ো ছিল। প্রায় আমার দ্বিগুণ লম্বা ছিল ওটা। আর তুমি তো অনেক ছোট । দেখতে যদিও একই অনেকটা”। মাছ বলল, “ওটা আমিই ছিলাম। আমি চাইলে যেকোনো আকার, যেকোনো রুপ নিতে পারি। তুমি ভয় পেলে বলে আমি ছোট হয়ে গেছি”। “আর আমি কোন গ্রহ থেকেও আসিনি। আমি তোমাদের সূর্যেরই মত একটা নক্ষত্রের বাসিন্দা। আমার নাম তোমার ভাষায় উচ্চারণ করা যাবেনা। অনেকটা তোমাদের ৪ এর মত দেখতে একটা অক্ষর আছে আমাদের। ওটাই আমার নাম। আমাদের নক্ষত্রে সবার নামই এরকম একটা অক্ষর দিয়ে। আমরা মনে করি নামের জন্য একটা অক্ষর বা চিহ্নই যথেষ্ট। তাই ওটা নিয়ে আর খুব একটা মাথা ঘামাইনা”। এর মধ্যেই বিনু বলে উঠলো, “এরকম কটা অক্ষর আছে তোমাদের যে সবার নাম দেওয়া যায়?” ৪ বলল, “সে আছে ১লাখের ওপর। কিন্তু আমাদের লোকসংখ্যা অতো বেশি নয়। তাই অসুবিধা হয়না”। কিন্তু সূর্যের মত অতো গরম নক্ষত্রের মধ্যে তোমরা থাকো কিকরে? পুড়ে যাওনা?” বিনু চিন্তিত গলায় প্রশ্ন করলো। ৪ বলল “না না, আমরা অনেক তাপ সহ্য করতে পারি।অনেক ঠাণ্ডা, অনেক চাপ, অনেক ওজন সবই সহ্য করতে পারি আমরা। আমাদের বেঁচে থাকতে জল-বাতাস কিচ্ছু লাগেনা। তাই আমরা যেখানে খুশি যেতে পারি। এই যে এতদুর থেকে আমি এসেছি শুধু একটা ছোট্ট লাফ দিয়ে। সোজা এসে পড়েছি তোমার ঘরের জানলায়। কিন্তু সাইজটা আরও ছোট ছিল বলে তুমি তখন দেখতে পাওনি”। বিনু মুগ্ধ হয়ে শুনছিল। ৪ বলে চলল, “আর তুমি তখন বলছিলে না আমরা সব ভাষায় কথা বলতে পারি। ওটা আমাদের পূর্বপুরুষরা পারতো। ওদের ব্রেনে একটা মেমোরি কার্ডে ভাষাগুলো সংরক্ষিত থাকতো, এখন প্রযুক্তি অনেক এগিয়ে গেছে। তাই সেই মেমরি কার্ড দিয়ে বানানো হয়েছে একটা যন্ত্র, যার ফলে আমাদের কোন ভাষা জানতে হয়না, আমরা যা ভাবি, সেটাই তরঙ্গের মাধ্যমে শ্রোতার কাছে পৌঁছে যায়। আবার অন্যজনের ভাবনাটাও তরঙ্গের মাধ্যমে আমার কাছে আসে। এতক্ষণ তো আমরা দুজন এইভাবেই কথা বললাম। এর ফলে আমাদের দুজনের কথা আমাদের দুজনের মধ্যেই থাকলো। কেও শুনতে পেলনা”।
“তো যাই হোক, যে উদ্দেশ্যে আমার আসা সেটা বলি এবার। আমাদের এই বিশাল ব্রম্ভান্ডে রোজ প্রায় কয়েকশো গ্রহ, নক্ষত্র সৃষ্টি হচ্ছে। আমরা সব মিলিয়ে একটা সমীক্ষা করে জেনেছি, একমাত্র পৃথিবী গ্রহের সঙ্গে আমরা সেইভাবে যোগাযোগ করতে পারিনা। আমাদের টাইম জোনের সঙ্গে পৃথিবীর টাইম জোনের আকাশ-পাতাল ফারাক। এই পিছিয়ে থাকার কারণ পৃথিবীর বাসিন্দাদের মন ও মগজ অনেক বেশি আবর্জনায় পরিপূর্ণ। অর্থাৎ, হিংসা, লোভ, পরনিন্দা পরচর্চা, রাগ, কষ্ট, আলস্য ইত্যাদি প্রায় ৩০০০০কোটি খারাপ জিনিস বা জাঙ্ক ফাইল জমে আছে ।ফলে যে বিশাল পরিমান মেমরি প্সেস নষ্ট হচ্ছে, সেটা ফাঁকা থাকলে এতদিনে তোমরা আমাদের নক্ষত্রে চলে যেতে পারতে । তাই পৃথিবীর এই সমস্যার সমাধান করতেই আমার আসা”। ৪ এর কথা শুনে বিনু একটা বিশাল হাঁ করে ফেলেছিল। একটু ধাতস্থ হয়ে জিজ্ঞেস করলো, “এসব কি বলছ! আর তুমি কিকরে বা এসব ঠিক করবে বন্ধু?” ৪ বলে উঠলো, “আমরা অনেক দিনের চেষ্টায় একটা যন্ত্র বানাতে সক্ষম হয়েছি, যার কাজ হল এই জাঙ্ক ফাইলগুলো চিরকালের মতো বিনাশ করা এবং যাতে সেগুলি আর ফিরে আসতে না পারে তার একটা স্থায়ী ব্যবস্থা করা। সেটা আমি আজ তোমার শরীরে লাগিয়ে দেব। তারপর থেকে তুমি যার দিকে তাকাবে তার মধ্যের খারাপ জিনিসগুলো নষ্ট হয়ে যাবে। তোমার দ্বারা যারা ঠিক হয়ে যাবে, তারা আবার একইভাবে অন্য অনেকজনকে ঠিক করতে পারবে। তোমার মতো এরকম আরও অনেকজনকে এই যন্ত্র দেওয়া হবে,যাতে খুব দ্রুত পৃথিবীকে এই দূষণমুক্ত করা যায়”। বিনু এতো আশ্চর্য হয়ে গেছে যে আর কথা বলতে পারছেনা। ৪ বিনুকে ঘুম পাড়িয়ে দিল আর ওর শরীরে ঐ বিশেষ যন্ত্র বসিয়ে দিল। এর জন্য বিনুর একটু লম্বা ঘুম হবে। তাই ৪ ঘুমন্ত বিনুকে রেখে চলে গেল তার নিজের গন্তব্যে।
এদিকে বিনুর ঘুম ভাঙছেনা বলে বাড়িতে কান্নার রোল উঠে গেছে। সেই দুপুরে ঘুমিয়েছে ছেলে ,আর এখন রাত ৮টা। ৫জন ডাক্তার এসে ফিরে গেছেন কিছু করতে না পেরে। বিনুর মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “ছেলেটার জন্মদিন বলে দুপুরে কেক বানাচ্ছিলাম। আজ আর ছেলেটার কাছে শুতে আসিনি। আর এমন ঘুমলি বাবা!” এরকম ভাবে যখন ঘড়িতে প্রায় ১১টা বাজে, বাড়ির সবাই ভাবছে ‘আর কিছুই করার নেই, বিনু আর আমাদের মধ্যে ফিরবেনা’, তখন বিনুবাবু উঠে বসলেন। আর সে সবার দিকে তাকাতেই সবার মুখে হাসি ফুটল, কেও আর কাঁদছেনা। সবার সব দুঃখ যেন নিমেষের মধ্যে কোথায় মিলিয়ে গেল। মা বিনুকে জড়িয়ে ধরে হাসতে লাগলেন। আর বিনু তো মহা খুশি। এতদিনে তার জীবনে একটা সত্যিই অভাবনীয় কিছু ঘটল। জন্মদিনে তার নতুন করে জন্ম হল । এ যেন এক অন্য বিনু।
একটু পরেই রাত ১২টার ঘণ্টা বাজবে। সবাই উপস্থিত। বিনুর জন্মদিন। মায়ের বানানো কেকটা টেবিলে সাজানো রয়েছে,তার ওপর লেখা --
“শুভ জন্মদিন বিনু”

Khub valo....bachhader upojogi...hridoygrahi.👌👏👏
ReplyDeletevalobasa nis
ReplyDeleteValo
ReplyDeleteChoto boro sobar i khub bhalo lagbe. Khub sundor ar jugopojogi lekha.
ReplyDeleteKhub sundor hyeche golpo ta ❤
ReplyDelete