Thursday, January 13, 2022

ভালো নাকি মন্দ

 

আমার মতে আমি ভীষণ ভালো। আমি নিজেকে ভালো হিসাবে তৈরি করার চেষ্টায় প্রতিনিয়ত ব্যস্ত থাকি। কোন বিশেষ ব্যক্তি বা ব্যক্তিগণ ঠিক যেমনটা চান, আমি ঠিক তেমন ভাবেই নিজেকে গড়ে তুলতে সদা সচেষ্ট। কিন্তু তবু কেউ কেউ আমাকে নিয়ে খারাপ কথা বলে, আমার গুণাগুণ বিচার করে আমাকে তুলোধোনা করে ছাড়ে। তবে কি আমি ভালো নই!

এই চিন্তা কমবেশি সবার মনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এই সবার তালিকায় সবার প্রথম বোধহয় আমারই স্থান। আমরা সবাই দৌড় প্রতিযোগিতায় প্রথম হওয়ার মতো ভালো হওয়ার জন্য দৌড় লাগাই, আর সেটা বোধহয় ভালোর প্রকৃত অর্থ না জেনেই। ভালোর সংজ্ঞা দেবনা, কিন্তু আমার ব্যক্তিগত ধারণা বলবো। আপনারাও নিজস্ব মতামত জানালে খুশি হব। সবার ধারণা নিশ্চয় আলাদা হওয়াই স্বাভাবিক।

‘ভালো’ কথাটা নিঃসন্দেহে আপেক্ষিক।কলেজে থার্ড ইয়ারে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদ পড়তে গিয়েও বুঝিনি যে বিশ্ব জগতের সব কিছুই এইভাবে আপেক্ষিক হবে। পাঠক বন্ধুরা হয়তো রেগে গিয়ে বলবেন, ‘এই তো দিদি, এই তোমার এক দোষ। নিজে ফিজিক্‌স নিয়ে পড়েছ বলে কথায় কথায় ফিজিক্‌স এর বুলি আওড়াও। হচ্ছিলো কথা ভালো-মন্দ নিয়ে, কোথা থেকে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদ নিয়ে চলে এলে’। আরে তা না, যত কঠিন ভাবা যায় ততই কঠিন লাগে- সে জীবনই হোক বা ফিজিক্‌স। যাই হোক, ভালোর মানে কিন্তু শুধু ব্যক্তি বিশেষেই নয়, সময়, স্থান বিশেষেও বদলাতে থাকে। এই ধরুন এক ঘণ্টা আগেও মনে হচ্ছিলো ,এবারে বেশ ভালোভাবে পড়া হয়েছে, পরীক্ষাটা মনে হচ্ছে ভালই হবে। আর অমনি একজন এসে প্রশ্ন করলো, ‘এটা পড়েছিস?’ বা ‘এটার উত্তর কি হবে বলতো?’ আর আমার ভালোর সংজ্ঞা গেল বদলে।

তাই বলা যায়, যে বা যারা আমাদের মনে ভাবনা তোলে যে আমি ভালো নই, বরং মন্দ হতে পারি ,তাদের কাছে ভালোর সংজ্ঞা অবশ্যই আলাদা। তাঁরা আমাকে নিশ্চয় নিজেদের ধ্যানধারণা, নিজেদের দৃষ্টিকোণ থেকেই বিচার করবেন। তাই তাঁর বা তাঁদের মতে আমি যেমন , প্রকৃতপক্ষে আমি তেমনটা নাও হতে পারি। জীবনে ওঠা-নামা সবারই থাকে। কঠিন সময়ে জীবনটা নিয়ে এগিয়ে চলা দুঃসাধ্য মনে হয়। আবার সেই কঠিন সময়টা পেড়িয়ে গেলেই পিছন ফিরে নিজেকেই কত ভালো বা বড় মনে হয়, যে এত কঠিন সময়েও আমি মনের জোর হারাইনি, লড়াই করে গেছি। ঠিক যেমন পথ চলতে কাদাজল ও থাকে, মসৃণ সুন্দর রাস্তাও থাকে। কাদাজল পেড়িয়ে যেতে আমাদের বেগ পেতে হয় বইকি। সব পেড়িয়েই আমরা এগিয়ে যাই, তবু চলা থামাইনা। কিন্তু যে আমাকে অনেক ওপর থেকে দেখছে, সে দেখছে আমি শুধুই পুতুলের মতো হাত পা নেড়ে চলছি, কালের নিয়মে যেমনটা সবাই চলে। সে কিন্তু আমার পথের এত বাধা, লড়াই কিছুই দেখছে না। তাই আমার জীবনের ভালো মন্দ বিচার করার কোন ক্ষমতাই তার নেই। আমার জীবনটা একটা সিনেমা হলে, সে নিতান্তই দর্শক মাত্র। তাই নিজের ভালো মন্দ বিচারের ভার অন্যের হাতে তুলে দেবেন না দয়া করে। কেবল মাত্র আপনিই জানেন আপনি কি, কেউ আপনাকে খুব কাছ থেকে দেখলে বা জানলে সে হয়তো বা বুঝতে পারবে আপনার জীবনের গুরুত্ব। তাছাড়া আর কারোর পক্ষেই জানা সম্ভব না আপনি আসলে কি বা কে?

সবার চোখে ভালো হওয়ার চেষ্টাতেই যদি জীবনটা অতিবাহিত করি, তাহলে নিজের ভালোলাগা, নিজের সখ, নিজের স্বপ্নপূরণের চেষ্টা কবে করবো? আপনার জীবন তো আপনার একারই,সে যতই তার সাথে আরও অনেকের জীবন জড়িয়ে থাকুক। কারোর ভালো বাবা বা মা, বা ভালো সন্তান, ভালো ভাই বোন হওয়ার চেষ্টা নিশ্চয় করবো আমরা সবাই। কিন্তু সেটা নিজেকে অবহেলা করে নয়, নিজেকে হারিয়ে ফেলে নয়। নিজেকে নিঃশেষ করে যন্ত্রের মতো জীবনযাপন –সে তো মৃত্যুর নামান্তর। কিছু একটা লক্ষ্য করে আমরা যে যার জীবনে এগিয়ে চলি, এগিয়ে তো চলবই, কিন্তু সেটা সুপারসনিক গতিতে নয়, জীবনটাকে উপভোগ করে।

আপনি ভালো হন বা মন্দ, যে আপনার ভালো মন্দ বিচারের ভার নিয়েছে, তার জীবন নিজস্ব নিয়মেই চলবে। সুতরাং, কারোর কথায় নিজেকে খারাপও ভাবার কোন কারণ নেই, নিজেকে বদলানোরও প্রয়োজন নেই। আপনি নিজের নিয়মেই চলুন, যেমন চন্দ্র, সূর্য, গ্রহরা প্রতি নিয়ত নিজের নিয়মেই ঘুরে চলেছে। মানুষের জীবনে যেমন ঝড় ওঠে, সৌরজগতেও এরকম অনেক ঝড় ওঠে। তাতে ওদের কারোরই গতির কোন পরিবর্তন হয়না। আমাদেরও ওরকম হতে হবে। বলবেন, ওরা তো জড় পদার্থ। ওদের কি কোন অনুভূতি বোধ আছে নাকি? বেশ তো, অনেক বড় মানুষরাও অনেক সমালোচিত হন, অতীত থেকে বর্তমান তার উদাহরণ প্রচুর। বিজ্ঞানের ইতিহাসে এরকম অনেক মানুষকে অনেক লাঞ্ছনা ভোগ করতে হয়েছিল তাঁদের আবিষ্কারের জন্য। তাতে তাঁদের ধারণার কিছুমাত্র বদল হয়নি। যা ঠিক তা আজীবন ঠিকই থাকে, যা ভালো তা ভালোই। কেউ তার বিচার করে খারাপ প্রমাণ করতে চাইলেও তা ভালোই থাকবে আজীবন। তাই লোকের কথায় কি আর আসে যায়। তাইনা?

পুনশ্চঃ কারোর মনে হতেই পারে, এত বড় বড় কথা লিখছি যখন, নিজের জীবনে নিশ্চয় সেগুলো মেনে চলি। তাহলে বলি বন্ধুরা, আমার লেখার পাঠক যেমন আপনারা, আমি নিজেও আমার লেখার পাঠক। আমি নিজেও আমার লেখা থেকে কিছু শেখার চেষ্টা করি। যা লিখি, তা সত্য বলে বিশ্বাস করি বলেই লিখি। আমার যা কাজে লাগে, আমার পাঠকদেরও তা কাজে লাগতে পারে ভেবে লিখি। আশা করি, বোঝাতে পারলাম। অনেকদিন পর লিখলাম, কেমন লাগলো জানাবেন অবশ্যই। ভালো থাকবেন। নমস্কার।

2 comments:

  1. Darun laglo,evabei lekha cholte thakuk.

    ReplyDelete
  2. দারুণ।তোর প্রতিটা লেখাই মনের এত গভীর থেকে,সবার মনই ছুঁয়ে যায়।কথাগুলো সবাই জানি।কিন্তু সবাই কি মেনে চলি?আমি অন্তত আজ থেকে যতটা পারি মেনে চলব।

    ReplyDelete

টোকা

এটা কে রে যে আমার পেছনে সবসময় টোকা মেরে বলতে থাকে 'u can do it, u can do everything'. Who is this? এ কি আমাকে শান্তিতে বাঁচতেও দেবে...