Tuesday, May 25, 2021

জন্মান্তর

 

আজ নীলের ২০বছর পূর্ণ হল ।প্রতি বছরের মতো এবারেও মহা ধুমধামে পালিত হচ্ছে ওর জন্মদিন। সকাল থেকেই বাড়িটা আত্মীয়স্বজন-বন্ধুবান্ধবের হৈহল্লায় মুখর । নীল অবশ্য অন্য একটা কারণে আজ ভীষণ খুশি। সেই ছোট থেকে ও এই দিনটার জন্য অপেক্ষা করেছিল। আজ তার স্বপ্নপূরণের দিন।

ছোট থেকেই নীল ওর সব আত্মীয়দেরই দেখেছে। দেখেনি শুধু ওর দিদুনকে, তার মামাবাড়ির একমাত্র উনিই জীবিত আছেন। কিন্তু দিদুন অসুস্থ বলে নীলের মা, সৃজাদেবী কখনও নিয়ে যাননি নীলকে ওনার কাছে। মাঝেমাঝে যখন নিজে যেতেন নীল খুব বায়না করত, কখনও আবার রাগারাগিও করত, কিন্তু কোন লাভ হতোনা। এমনকি দিদুনের কি হয়েছে সেটাও জানানো হয়নি নীলকে। কিন্তু যতই বাধা পেয়েছে, ততই দিদুনের কাছে যাওয়ার লোভ বেড়ে গেছে নীলের। মনে মনে দিদুন কেমন দেখতে কল্পনাও করেছে সে। ভীষণ ভালোবাসে ও দিদুনকে।

সেই দিদুনের সঙ্গে দেখা করার দিন আজ- সৃজাদেবী ছোট থেকে ছেলেকে এই কথাই বলে এসেছেন। তাই আজ বিকেলে নীল ওর অতিপ্রিয়, কিন্তু অদেখা অচেনা মানুষটির সঙ্গে দেখা করতে যাবে। সঙ্গে যাবে ওর বন্ধুরা। তাই এবারের জন্মদিনটা অন্যবারের থেকে একদম আলাদা।  

‘মা যে ঠিকানাটা দিল সেটা দিদুনের বাড়ির । দিদুন খুব অসুস্থ বলেই জানি। কারণ প্রতিবারই ওখান থেকে ফেরার পর মায়ের মুখটা থমথমে দেখতাম। জিজ্ঞেস করেও জবাব পাবোনা বলে মাকে কিছু জিজ্ঞেসও করতাম না। আচ্ছা, মা আসার সময় আমাকে অতো আদর করছিলো কেন? কাঁদছিলই বা কেন? মায়ের তো খুশি হওয়ার কথা। জানিনা, আমি মাকে মাঝেমাঝে বুঝতে পারিনা’ – এইসব ভাবতে ভাবতে কখন যে গন্তব্যে পৌঁছে গেছে, টেরই পায়নি নীল। সকলের ব্যস্ততা ও চিৎকারে সম্বিৎ ফেরে তার।

দিদুনের বাড়িটা পুরনো দিনের দোতলা বাড়ি।বাড়িতে না ঢুকে প্রথমেই ওরা চারপাশটা ঘুরে দেখতে লাগলো। বাড়িটার সামনে পিছনে বাগান। সামনের বাগানটা ছোট। কিছু ফুলের গাছ, পাতাবাহার গাছ, আর একটা তুলসীতলা । বাড়ির পিছনের দিকে গিয়ে ওদের সবার চোখ ধাঁধিয়ে গেল। এ তো স্বর্গরাজ্য! বাগানের ঠিক মাঝখানে একটা ঘাট বাঁধানো জলাশয়। তাতে পদ্ম ফুটে আছে। পুরো বাগান জুড়ে প্রচুর ফুলের গাছ। বাগানের ভেতরদিকে অনেকগুলো বড় গাছ। বেশ কিছু সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো বসার জায়গা। তারই একটায় বসে পড়ল নীল। গাছে গাছে পাখির ডাক, ফুলের মিষ্টি সুবাস। তার মনে হল এরকম একটা জায়গা যেন সে আগে দেখেছে। কে জানে, হয়তো তার কল্পনায়। দিদুন অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও তার বাগান এত সুন্দর পরিপাটি করে সাজানো কিভাবে সেটাই ভাবতে লাগলো সে।

 ভাবনায় ছেদ পড়লো তার এক বন্ধুর ডাকে- ‘তোর আজ জন্মদিন, এত মনমরা কেন? আমরা সবাই ফটো তুলছি, আর তুই এখানে একা বসে কি করছিস? চল, সবাই মিলে ফটো তুলি’। সত্যিই তো সে আজ বারবার অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছে। ফটো তলার মাঝেই এই বাড়ির কেয়ারটেকার বলরাম মামা ডাকতে এল –‘তোমাদের জন্য একটু জলখাবারের ব্যবস্থা করেছি, তোমরা ভেতরে চলো’।

 

জলখাবার খেয়ে যে যার মতো এদিক ওদিক ঘুরতে লাগলো। নীল জানতে পারলো, দিদুন রোজ বিকেল ৫টায় বাগানে যায়। এখনো বেশ কিছুটা সময় হাতে আছে ভেবে সে ঘরগুলো ঘুরে দেখতে লাগলো। দিদুনের ঘরটা বোধহয় ওপরতলায় । নিচের প্রতিটা ঘরে ঢুকেই নীল অবাক। সুন্দর পরিপাটি ঘর, আর দেওয়ালে টাঙ্গানো তার নিজেরই ফটো। সঙ্গে এক সুন্দরী ভদ্রমহিলা । সে তো অনেক চেষ্টা করেও মনে করতে পারলনা সে আগে কবে এখানে এসেছে। সে কি কিছু ভুলে যাচ্ছে! কই, ছোট থেকে সব ঘটনাই তো তার মনে আছে। তবে এসবের মানে কি? কেও কি তার সঙ্গে মজা করার জন্য এরকম ফটো বানিয়েছে! কিন্তু কেন? ভীষণ অসহায় বোধ করে নীল। সঙ্গে সঙ্গে মাকে একটা ফোন করে সে। সব শুনে সৃজাদেবী শান্ত গলায় বললেন, ‘ওটা আমার বাবা-মার ফটো। তোকে ঠিক তোর দাদাইয়ের মতো দেখতে হয়েছে। দিদুনের সঙ্গে দেখা…’ – ওনার কথা শেষ হওয়ার আগেই ওপরতলা থেকে কারোর নামার শব্দ পাওয়া গেল।

 নীল তখন ঘোরের মধ্যে রয়েছে। বসার ঘরে এসে দিদুনকে দেখেই তার মধ্যে অদ্ভুত পরিবর্তন দেখা গেল। মাথাটা বনবন করে ঘুরতে লাগলো। চোখে সবকিছু ঝাপসা লাগতে লাগলো। মনে পড়ে গেল সব পুরনো কথা। কিভাবে দু’বাড়ির অমতে মন্দিরে গিয়ে বিয়ে করেছিল ওরা দুজনে। সাম্য আর রাশি। তারপর নিজেদের মনের মতো করে বানিয়েছিল এই বাড়ি,বাগান, তাদের ভালোবাসার সংসার। ওদের স্বর্গরাজ্য ছিল এই বাগানবাড়ি। রোজ বিকেলে দুজন মিলে বাগানে ঘুরত, বসে কত গল্প করতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা। সব মনে পড়তেই আনন্দে-আবেগে সে জড়িয়ে ধরল রাশিকে। রাশি(নীলের দিদুন) বলে উঠলো, ‘সাম্য, তুমি এসেছ। আমি জানতাম তুমি একদিন ঠিক আসবে। তাই এতকাল ধরে তোমার জন্য অপেক্ষা করে চলেছি । সেদিনও কত অপেক্ষা করেছিলাম, তুমি এলেনা, ওরা বলল তুমি আর নেই। কিন্তু আমি জানতাম তুমি আমাকে ছেড়ে কোথাও যেতে পারোনা। তাই এই ৫০টা বছর রোজ বিকেলে বাগানে গিয়ে বসতাম। ওটা আমাদের প্রিয় জায়গা ছিল, ওখানে যদি তুমি ঘুরতে আসো। তাই…’। সাম্য(নীল) বলল, ‘আমি আর কক্ষনো তোমায় ছেড়ে যাবো না, কথা দিলাম’।

‘ কাল থেকেই বারবার বলছিলেন উনি , যে আজ আপনি আসবেন। যাক, আপনি এসে গেছেন, এবার আমার ছুটি। আমি তাহলে আসি’- ডাক্তারবাবুর কথা শুনে সাম্য ও রাশি দুজনেই ঘুরে তাকালেন । হাসি মুখে বিদায় জানালেন ডাক্তারবাবুকে। ‘রাশি, আমাদের সেই বইগুলো আছে? মনে আছে আমরা দুপুরবেলায় বসে বসে রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্র পড়তাম?’ সাম্যের কথায় হেসে ফেলল রাশি-‘সব আছে ।চলো এখন বাগানে যাই’।


ওরা বেড়িয়ে গেলে সেদিকে অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো নীলের বন্ধুরা। ওরা যেন নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছিল না। চোখের সামনে যেন সিনেমা দেখছে মনে হচ্ছিল। ওরা ছুটে বাইরে এসে ডাক্তারবাবুকে জিজ্ঞেস করলো, ‘এটা কিরকম হল? নীল আমাদের সঙ্গে ফিরবে না? ও এরকম অদ্ভুত ব্যবহার কেন করছে?’ ডাক্তারবাবু বললেন, ‘নীলের দিদুন শ্রীমতী রাশিমালা দেবীর কেসটা একটু অন্যরকম। ওনার স্বামী সাম্য মারা যান একটা দুর্ঘটনায়। কিন্তু এই কথাটা বিশ্বাস করতে পারেন নি রাশি দেবী । উনি প্রচণ্ড একটা মানসিক আঘাত পান। অনেক বছর পরেও তিনি একইভাবে বিশ্বাস করতেন তাঁর স্বামী একদিন ঠিক ফিরে আসবেন। ওনার মেয়ে বড় হয় একটা হোমে। তারপর ওনার বিয়ের পর আমি এই কেসটা হাতে পাই। তার আগে আমার স্যার দেখতেন ওনাকে। কিছু করার নেই জেনেও শুধুমাত্র সৃজা দেবীর অনুরোধে চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হয় আমাদের। তারপর কয়েক বছর আগে উনি এসে ওনার ছেলের ফটো দেখিয়ে বললেন, উনি একটা আশার আলো দেখেছেন, নীলকে হুবহু ওর দাদুর মতো দেখতে। তাই এটা যদি কোন ভাবে আমাদের চিকিৎসায় সাহায্য করে। আমি তখনই নীলকে এখানে পাঠিয়ে দিতে বলি। কিন্তু সৃজা দেবী বললেন, আগে নীলের ২০ বছর বয়স হোক তারপর ও আসবে। তারপর আজ নীলের এখানে আসার পর থেকে কি কি ঘটলো তা তো তোমরা নিজের চোখেই দেখলে’।

-‘কিন্তু নীল আমাদের সঙ্গে না ফিরলে আমরা ওর মাকে কি জবাব দেব ?’

-‘দেখো, সৃজা দেবীকে আমি আগেই জানিয়েছিলাম নীলের এতে বিপদ হতে পারে। হয়তো ও আর কোনদিন নাও ফিরতে পারে। উনি সবটা জেনেই নীলকে এখানে পাঠিয়েছেন। আমি বুঝতে পারছি তোমাদের বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। আমারই এখনো বিশ্বাস হচ্ছেনা। তবু সত্যিটা সত্যিই। আমাদের মেডিক্যাল সায়েন্সে এর কোন ব্যাখ্যা নেই । শুধু এইটুকুই জেনে রাখো , আজ আমরা সবাই এক বিরল ঘটনার সাক্ষী হয়ে রইলাম। আমার মনে হয় ওদের এখন ওদের মতো থাকতে দেওয়াই ভালো। চলো, তোমরা নিশ্চয় নীলদের বাড়ি যাবে? আমারও সৃজা দেবীর সঙ্গে কথা বলার দরকার। চলো, একসঙ্গেই যাওয়া যাক’।

ফেরার পথে ওরা কেউ আর একটা কথাও বলতে পারেনি।

সৃজা দেবী ডাক্তার বাবুর সঙ্গে কথা বলে নিজের ঘরে ফিরে এলেন। আলমারি থেকে তাঁর বাবা-মার একটা ফটো বার করে দেওয়ালে ছেলের ফটোর পাশে টাঙ্গিয়ে দিলেন। ‘বাবা ,আজ তোমার মৃত্যু দিনে তোমাকে আবার ফিরে পেলাম। ছোট থেকে তো তোমার ভালোবাসা পাইনি। আর আমার ছেলের জন্মদিনে ওকে আমি হারিয়ে ফেললাম’ –বলে কান্নায় ভেঙে পড়লেন উনি। তারপর ছেলের ফটোটা বুকে আঁকড়ে ধরে বলতে লাগলেন, ‘তুই খুব রাগ করতিস তোকে দিদুনের সঙ্গে দেখা করতে দিতামনা বলে। তোকে ২০টা বছর নিজের কাছে নিজের করে পাওয়ার খুব লোভ হয়েছিল রে। যদি বুঝিস তো আমাকে ক্ষমা করে দিস। আর তোর পুরনো জীবনটা নষ্ট করে দিলাম বলেও ক্ষমা করিস। হয়তো তোর মা খুব স্বার্থপর। তুই যেখানেই থাকিস ভালো থাকিস বাবা’।

 

..

11 comments:

  1. খুব সুন্দর লিখেছেন ম্যাম🥰

    ReplyDelete
  2. 🙂ভালোবাসা নিস।

    ReplyDelete
  3. Osadharon ovigyota holo. Chokher samne puro ghotona ta chobir moton dekhte pacchilam. Evabei likhte thaak.

    ReplyDelete
  4. Khub sundor hoye6 mam ❤❤❤

    ReplyDelete
  5. খুব ভালো হয়েছে

    ReplyDelete
  6. Osadharon....dudantto....hats off to you..

    ReplyDelete

টোকা

এটা কে রে যে আমার পেছনে সবসময় টোকা মেরে বলতে থাকে 'u can do it, u can do everything'. Who is this? এ কি আমাকে শান্তিতে বাঁচতেও দেবে...